মৌলিক সংস্কার সুদূরপরাহত

স্বৈরতান্ত্রিক অরাজকতা, না গণতান্ত্রিক অরাজকতা?

সাধারণ মানুষের জীবনে এই দুয়ের বাইরে বিকল্প খুব একটা থাকেও না আজকাল। নিরুপায় হয়ে কেউ বলে, আমাকে সামরিক শাসন দিন, বন্দুকের গুঁতো খেয়ে আমি চুপ করে থাকব—তবু শান্তিতে থাকা যাবে।

 
মীজান রহমান
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ০০:৩৭
প্রিন্ট সংস্করণ
 
স্বৈরতান্ত্রিক অরাজকতা, না গণতান্ত্রিক অরাজকতা?
 

সাধারণ মানুষের জীবনে এই দুয়ের বাইরে বিকল্প খুব একটা থাকেও না আজকাল। নিরুপায় হয়ে কেউ বলে, আমাকে সামরিক শাসন দিন, বন্দুকের গুঁতো খেয়ে আমি চুপ করে থাকব—তবু শান্তিতে থাকা যাবে। আবার কেউ বলে, না, আমি গণতন্ত্র চাই, শান্তি থাক বা না থাক। দরকার হলে তাদের ভোট দিয়ে গদি থেকে নামাতে পারব।

দুঃখের বিষয়, সচরাচর তাও সম্ভব হয় না আজকাল। ভোট দিয়ে এক দলকে সরিয়ে তারা আরেক দলকে বসায়মাত্র। ওদিকে বন্দুকের নল দিয়ে চুপ করানো যত সহজ, শান্তি স্থাপন তত নয়।

না, পশ্চিম বিশ্বের কথা বলছি না আমি, বলছি আমাদের হতভাগা মুসলমান দেশগুলোর কথা। সেই যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সূর্য ডুবে গেল, ইসলামিক জগতে তার পর থেকে তো ঘোর অন্ধকারের ভেতরেই আমরা কেবল হাতড়ে বেড়াচ্ছি। কেবলই অছিলা খুঁজছি, কেমন করে নিজেদের দায়িত্বের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপানো যায়। পশ্চিমা বিশ্ব যখন শূন্যযানে করে মহাকাশ ভ্রমণের যোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত, আমরা তখন কোমর বেঁধে রওনা হয়েছি কোথায় শত্রু পাওয়া যায়। আমরা মহাকাশে যেতে না পারলেও ওদের যাওয়াটা যেন ঠেকাতে পারি। জানি সবাই তা নয়, কিন্তু যারা সেই কাতারে পড়ে, তাদের তো বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে না কেউ, বরং পেছন থেকে বাহবা দিয়ে যাচ্ছে।

মিসরের কথাই ধরুন, কিংবা তিউনিসিয়া বা ইয়েমেন, লিবিয়া, বাহরাইন; এখন সিরিয়া।

কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। ঠিক আছে, তিউনিসিয়া দিয়েই শুরু করা যাক। কারণ, সেখান থেকেই তো ইসলামিক ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায়ের শুরু। পশ্চিমা বিশ্বে যার নামকরণ হয়েছে: অ্যারাব স্প্রিং। আরবি বসন্ত। বাহ, কী সুন্দর নাম! মলয় বাতাস নবপল্লবিত পুষ্পকলির স্নিগ্ধ সুবাস বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাহারা থেকে সিরিয়ার শেষ প্রান্তে—ভাবতেই অঙ্গ জুড়িয়ে যায়। মনে আছে দিনটা? ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ সাল। মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামক এক শিক্ষিত বেকার যুবক সমগ্র আরব জাতির যুবসম্প্রদায়ের যুগ যুগব্যাপী বন্ধ্যাজীবনের চরম হতাশা নিজের স্কন্ধে ধারণ করে প্রকাশ্য রাজপথে তাঁর সমস্ত শরীরে তেল ঢেলে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। সেই জ্বলন্ত আত্মদান ক্ষিপ্ত শিখা হয়ে দান্তের ইনফার্নোর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে। পরের দিন ১৮ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার নগরে নগরে যুবক-যুবতীরা দলে দলে, হাজারে হাজারে, বিক্ষোভের ঝান্ডা বহন করে দখল করে নেয় রাস্তাঘাট, অলিগলি। জন্ম নেয় দুটি সুন্দর শব্দ, একটি নতুন কবিতার কলি—‘আরবি বসন্ত!’ এবার তাদের দাবি কেবল ভাতকাপড় আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নয়, এবারের দাবি আরো সুদূরপ্রসারী—আমূল পরিবর্তন। গণতন্ত্র! হ্যাঁ, তারা আশু পতন কামনা করে দীর্ঘকালীন সামরিক স্বৈরতন্ত্রের। তারা নির্বাচিত সরকার চায়। সারা আরব মুলুকে যা কোনো দিন কেউ কল্পনাতে স্থান দিতেও সাহস পায়নি। ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘ইসলাম’ যেন পরস্পরবিরোধী দুটি শব্দ, যাদের একত্রীকরণের চিন্তাও একরকম দণ্ডনীয় অপরাধ। তিউনিসিয়ার তরুণদের মনে এই সুঃসাহসী স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছিল মোহাম্মদ বোয়াজিজির চামড়াপোড়া দেহ। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল পশ্চিমের পণ্যবাজার থেকে আগত আধুনিক প্রযুক্তি—সোশ্যাল মিডিয়া, আইফোন, স্মার্টফোন, টেক্সটিং, টুইটার। বুর্গিবা বুলাভার্ডের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত তিউনিসিয়ার নতুন যুগের নতুন তরুণদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মঞ্চ। তাদের রোধ করার শক্তি তখন কারোই ছিল না। সেনাবাহিনীর না, রাজনৈতিক নেতাদের না, গতানুগতিক সামাজিক মুরুব্বিদের না—এ এক অদম্য শক্তি তখন।

১১ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে কায়েম হয়ে বসে থাকা স্বেচ্ছাচারী শাসক জিনেল আবদিন বেন আলী অধোবদনে বহির্গত হয়ে আসেন রাজপ্রাসাদের সদর দরজা দিয়ে। তিউনিসিয়ার দীর্ঘকালীন একনায়কত্বের অবসান। গণতন্ত্রের বাতাস বইতে শুরু করেছে চারদিকে। সাজসাজ রব দেশব্যাপী—ভোটকেন্দ্র, আইনসভার সদস্য মনোনয়ন ও নির্বাচন, জনসাধারণ, ছোট-বড়, গরিব-ধনীসহ সব শ্রেণীর নাগরিক লাইন করে দাঁড়ায় ভোটের জায়গাতে। সে এক তুমুল উত্তেজনা—সারা মধ্যপ্রাচ্যে, ইসলামশাসিত রাজ্যসমূহে যা কোনো দিন দেখেনি কেউ। তারা মুসলিম বিশ্বের নতুন যুগের অগ্রদূত।

ভোট হয়ে গেল। মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই। কিন্তু মুসলিম জগতের সেই চিরপরিচিত শত্রু। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি সত্যি সত্যি সংস্কার কামনা করেছিল, না কেবলই সরকার পরিবর্তন? গণতন্ত্র তো শুধু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে একটা বাক্সের ভেতর টিপসই দেওয়া এক টুকরা কাগজ নয়, এর পেছনে অনেক অনেক উপাদান আছে, যার জন্য দীর্ঘদিনের সামাজিক-মানসিক-সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি দরকার। সে প্রস্তুতি কি তিউনিসিয়ার দেশবাসীর ছিল? নাকি ছিল বুর্গিবা বুলোভার্ডের সেই নতুন যুগের প্রযুক্তিমনা তরুণদের? আন্দোলন মানেই তো বিপ্লব নয়। আর সব বিপ্লবও সব সময় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে না দেশে। কোনো বড় আইডিয়া তাকে চালিত করতে হয়। অ্যারাব স্প্রিংয়ের পেছনে কি সেই ‘বড় আইডিয়া’র মদদ ছিল?

ভোটাধিক্যে জয়ী হলেন কারা? কোনো আধুনিক শিক্ষাদীক্ষায় সুশিক্ষিত উচ্চমানের চিন্তাশীল দল, নাকি কোনো শ্রমিক-চাষির স্বার্থসেবী গণদরদি দল? না, কোনোটাই নয়। জয়ী হয়েছিল একটি কট্টর ইসলামপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দল।

তিউনিসিয়ার জনসংখ্যা এক কোটি। প্রায় ৯০ ভাগ লোকই আরব বংশোদ্ভূত এবং তারা ভীষণ ধার্মিক। অনেকেই ‘সালাফি’ মতবাদে দীক্ষিত। আরবি ‘সালাফ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ পূর্বপুরুষ। এর তাৎপর্য হলো যে সালাফিরা এতই ধর্মনিষ্ঠ যে সেই প্রাচীন যুগের পূর্বপুরুষদের মতো করেই তারা ধর্ম-কর্ম পালন করতে আগ্রহী—যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর কোনো রকম দায়বদ্ধতা তারা স্বীকার করে না, বোঝেও না হয়তো। অনেকটা আমেরিকার ‘কোয়েকার’ বা ‘আমিশ’দের মতো। পেনসেলভানিয়া অঞ্চলের আমিশরা তো এখনো ঘোড়ার গাড়িতে করে চলাফেরা করে, মোমবাতি আর কেরোসিনের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতের গৃহকার্য পালন করে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি—এসব তাদের জন্য হারাম। তিউনিসিয়ার সালাফিরাও অনেকটা ইসলাম ধর্মের আমিশ বললে অত্যুক্তি হবে না। মুশকিল হলো, এই সাধারণভাবে অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় সালাফিদের মধ্যে আজকাল বেশ কিছু উগ্র মতবাদের আল-কায়েদার অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে। এই অল্পসংখ্যক জঙ্গি সালাফিদের কারণেই তিউনিসিয়ার জাতীয় জীবনের অগ্রগতি বারবার ব্যাহত হচ্ছে।

তিউনিসিয়া দেশটি একসময় ফরাসিদের দখলে ছিল—নামে ‘প্রটেক্টরেট’ হলেও কার্যত উপনিবেশ। সেই ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে পূর্ণ মুক্তি তারা লাভ করে ১৯৫৬ সালে, মুখ্যত তাদের জনপ্রিয় নেতা হাবিব বুর্গিবার দক্ষ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে। তখন থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পুরো দেশটাই ছিল বলতে গেলে বুর্গিবা যুগ। তিনি নিজে প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত ছিলেন অনেক বছর। এরপর যখন অন্য কেউ তাঁর স্থান দখল করেন, তখনো হাবিব বুর্গিবা যা বলতেন, সেভাবেই চলত দেশ। তাঁর মৃত্যুর পর নেতৃত্বের আসন দখল করেন বেন আলী, যাঁর নাম উল্লেখ করা হলো একটু আগে। তিনি অত্যাচারী নেতা ছিলেন, তেমন অভিযোগ হয়তো কেউ করবে না, কিন্তু স্বৈরাচারী ছিলেন তো বটেই। দেশকে যথাসত্বর আধুনিকতার পথে চালিত করার জন্য তিনি যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিলেন, ছলে-বলে-কৌশলে গোঁড়া সালাফিদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করে নিয়ে, যা বিপুলভাবে সফল হয়েছিল বলে কোনো তিউনিসিয়ানই হয়তো মানবেন না। বুর্গিবা এবং বেন আলী দুজনই খুব আধুনিকতাপন্থী নেতা ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁরা দেশের গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে নতুন যুগের সঙ্গে পা রেখে চলার যোগ্য করে তোলার চেষ্টা বোধ হয় করেননি খুব একটা। এ কারণে আধুনিকতার নামে কিছু নতুন নতুন রাস্তাঘাট হয়েছে, দালানকোঠা উঠেছে পশ্চিমের মতো করে, কিছু কিছু ছেলেমেয়েকে দেশ-বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চ শিক্ষাদানেরও চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু ব্যাপকভাবে দেশজোড়া একটা ইহজাগতিক চিন্তাধারা গড়ে তোলার প্রয়াস তাঁরা হয়তো করেননি। ফলে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়তো হয়েছিল কিঞ্চিৎ, আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছিল প্রচুর, কিন্তু মনোজগতে কোনো অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আদৌ এসেছিল কি না সন্দেহ। তাই তিউনিসিয়ার মধ্যযুগ যেমন কায়েম হয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী, তেমনি কায়েম থেকেছে ২০১০ সালের তথাকথিত অ্যারাব স্প্রিংয়ের পরও। যার ফলস্বরূপই গণতান্ত্রিক উপায়েই নির্বাচিত হয়ে এসেছে প্রচণ্ড রকম রক্ষণশীল এক ইসলামি দল।

সৌভাগ্যবশত তাদের নিরঙ্কুশ ভোটাধিক্য ছিল না। বেশ কিছু বামপন্থী দলও আইনসভায় আসন দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। দুই পক্ষ তখন একসঙ্গে মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু চরম ডানপন্থীর সঙ্গে আধুনিক মনোভাবাপন্ন বামপন্থীদের আঁতাত কি কখনো সফল হয়েছে? না, হওয়া সম্ভব? দুয়ের লক্ষ্য তো সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন চায় পশ্চাৎমুখী গতি, আরেকজন সম্মুখপন্থী। আমেরিকার আমিশ আর কোয়েকাররা কখনো কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেনি। কারণ, খ্রিষ্টধর্মে ধর্ম আর রাজনীতি অবিভাজ্য—এ রকম কোনো মতবাদ প্রচার হয়নি কখনো, যা হয়েছে আমাদের ইসলাম ধর্মে। এই ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনের প্রতিটি বিষয়, প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটি কর্ম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ও অবিভাজ্য এবং সে কারণেই একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষে কখনোই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘সেক্যুলার’ হওয়া সম্ভব নয়; নেতারা যতই জোড়াতালি দিয়ে দুয়ের মিলন ঘটানোর চেষ্টা করুন না কেন। তাদের সম্পর্ক অনেকটা সাপে-নেউলের।

অবশ্যম্ভাবীভাবে অচিরেই দুই দলে সংঘর্ষ বেঁধে যায় তিউনিসিয়ায়। এ বছরের প্রথম দিকে, ফেব্রুয়ারি মাসে আততায়ীর হাতে নিহত হন সংসদের বিরোধীদলীয় সদস্য চোকরি বেলাইদ। একই সঙ্গে খুন হন আটজন তিউনিসিয়ান সেনা। সেই মামলা ফায়সালা হতে না হতেই জুলাই মাসের ২৫ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন জাতীয় আইন পরিষদের আরও এক সদস্য মহম্মদ ব্রাহ্মি। এ রকম খুনখরাবি আর কত কাল চলে তিউনিসিয়াতে কে জানে। দেশবাসী আন্দোলন করে গণতন্ত্র আদায় করেছে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পায়নি, তার বদলে পেয়েছে গণতান্ত্রিক অরাজকতা।

এবার মিসরের প্রসঙ্গে আসা যাক। তাদের ইতিহাস তিউনিসিয়ার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। মিসরীয় সভ্যতা কিংবদন্তীয়। ইতিহাসের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর অন্যতম। গ্রিক পণ্ডিত ইউক্লিডের জ্যামিতির সঙ্গে পরিচিত নয় এমন মানুষ পৃথিবীজুড়ে কোথাও পাওয়া দুরূহ হলেও জ্যামিতি বিষয়টির উৎপত্তি কিন্তু মিসরে। গ্রিক মহাপুরুষেরা যখন জ্যামিতি শিখতে শুরু করেছেন, ততক্ষণে মিসরের পিরামিড নির্মাণের কাজ প্রায় সমাপ্ত। এই পিরামিড কেবল সে কালের স্থাপত্যশিল্পেরই এক অত্যাশ্চর্য নিদর্শন নয়, ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির ওপর এক অবিশ্বাস্য রকম দখলেরও পরিচায়ক। ফারাও রাজপরিবারের সদস্যদের মমি করা শবদেহ সংরক্ষণের পদ্ধতি বর্তমান যুগের রসায়নশাস্ত্রের সিদ্ধ সাধকদেরও হতভম্ব করে ফেলে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সম্মানার্থে প্রতিষ্ঠিত আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের বিশ্ববিখ্যাত লাইব্রেরি পৃথিবীর বৃহত্তম ও সে সময়ের শ্রেষ্ঠতম পাঠাগার। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি মিসরের নৃপতিদের বিশেষ আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা যথার্থই ঈর্ষণীয়। কিন্তু সেটা বহুকাল আগের কথা। বর্তমান ইতিহাস ঠিক অতটা গৌরবমণ্ডিত কি না সন্দেহ।

১৫১৭ সালে তুরস্কের অটোমান সুলতানের সুসজ্জিত সেনাবাহিনী দ্বারা পরাস্ত হয় মিসরের স্থানীয় মামলুক বাহিনী। ১৫২৭ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত প্রায় একটানা ৩৪০ বছর তুর্কিরা রাজত্ব করেন সেখানে (ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা যেমন রাজত্ব করেছিলেন ২০০ বছর)। শেষ দিকের তিন বছর—১৭৯৮ থেকে ১৮০১ পর্যন্ত নেপোলিয়ানের আক্রমণের মুখে তাঁরা সাময়িকভাবে রাজ্যশাসনের ভার ফরাসিদের ওপর ছেড়ে দিলেও অচিরেই তা পুনরুদ্ধার করে নেপোলিয়ান ও তাঁর সেনাবাহিনীকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার পর আরও ৮৬ বছর তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন বলবৎ থাকে। ১৮৮২ সালের সময় থেকে মিসর ও অটোমান-শাসিত সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রতীচ্য, বিশেষ করে ব্রিটিশ হাওয়া বইতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জয়জয়কার—একদিকে ভারতবর্ষ, অপর দিকে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড এবং তার অনতিকাল আগে ছিল সমগ্র উত্তর আমেরিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তাদের লোভাতুর দৃষ্টি নিপতিত হতে থাকে মিসর তথা উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। এই রাষ্ট্রগুলো বেশ কয়েক শতাব্দী ধরেই কোনো না কোনো বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যে কারণে সেখানে গণতন্ত্র দূরে থাক, কোনো রকম জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনাও ঠিক দানা বেঁধে উঠতে পারেনি, অন্তত ‘সরকারি’ বৈধতার ছত্রচ্ছায়ায়। ১৮৮২ সাল থেকে মিসরে এক নয়, দুই বহিঃশক্তির ক্ষমতার লড়াইতে কুস্তির বস্তার মতো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে হয়—তুর্কি সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সম্ভবত, ওই সময় থেকেই মিসরের প্রাচীন কপ্টিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িকতার ভাব অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।

কথিত আছে যে মিসরের কপ্টিকরাই যিশুখ্রিষ্টের প্রথম দিককার অনুবর্তীদের একেবারে প্রথম সারিতে। বলা হয় যে আদি ধর্মপ্রচারক সেন্ট মার্ক মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার করতে শুরু করেন ৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। সেটা আস্তে আস্তে মিসরের সর্বত্র, এমনকি উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলেও বিস্তারিত হতে থাকে। স্থানীয় মূর্তি উপাসকেরা তো বটেই, এমনকি অনেক ইহুদিও এই নতুন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধর্মান্তর গ্রহণ করেন স্বেচ্ছায়। ইতিমধ্যে মতবাদ নিয়ে মূলধারার খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে মিসরীয় কপ্ট ভাষাভাষী খ্রিষ্টানদের একটা বিরোধ সৃষ্টি হয়ে যায়। এতে তারা বিভক্ত হয়ে তাদেরই নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ধারার চার্চ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে, একজন কপ্টিক পোপসহ। উদাহরণস্বরূপ, সমসাময়িক কালে, আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত কপ্টিক পোপ হলেন পোপ টোয়াড্রস-২, যিনি ভ্যাটিকানের রোমান ক্যাথলিক পোপ ফ্রান্সিস-১-এর শাসন মানতে বাধ্য নন। পোপ টোয়াড্রস কেবল মিসরেরই নয়, সমগ্র উত্তর আফ্রিকায় যেখানে যেখানে সেন্ট মার্কের পথানুসারী কপ্টিক খ্রিষ্টানরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তাদের সবারই ধর্মগুরু। ৬৩৯ সালে যখন মক্কা-মদিনা থেকে আগত নতুন ধর্ম ইসলামের আবির্ভাব ঘটে খলিফা ওমরের সময়, তখন দেশব্যাপী রীতিমতো একটা নতুন আন্দোলন শুরু হয়ে যায়—মিসরীয়রা দলে দলে সেই ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে, মূর্তি উপাসকেরাই শুধু নয়, বহু খ্রিষ্টান আর ইহুদিও। এভাবেই যা ছিল একটা পুরোপুরি খ্রিষ্টান-ইহুদি দেশ, সেটা প্রায় রাতারাতি পরিণত হয়ে যায় একটি মুসলিম রাষ্ট্রে।

কিন্তু ইতিহাসের এত সব উথাল-পাতালের মধ্যে কি কখনো কারও কল্পনাতে, বহু শতাব্দী পূর্বে সমুদ্রপারের দেশ গ্রিসে যে ‘গণতন্ত্র’ নামক একটি নতুন মতবাদের সৃষ্টি ও প্রচলন হয়েছিল, তা কি বিন্দুমাত্র স্থান পেয়েছিল? না, যত দূর জানা যায়, ইতিহাসের পাতা ঘেটে, তা হয়নি। ঠিক আমাদের দেশ, আদিম বাসভূমি ভারতবর্ষ, যে রকম গণতন্ত্রের মুখ দেখেনি কস্মিনকালেও। তার মানে এই দাঁড়ায় যে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দৃঢ়মূল হ�

1 comment on “মৌলিক সংস্কার সুদূরপরাহতAdd yours →

  1. ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার। যখন ই এটাকে পলিটিক্স এর সাথে মেশাবে তখন ই এটা উগ্রতায় রূপ নিবে। জঙ্গীবাদ এর সূচনা হবে।যেকোনো ধর্মেই উগ্রতার সৃষ্টি ই হয় এই ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা থেকে। এটা কেবল এই একবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে এমন না। এর সূচনা সেই ধর্মের সৃষ্টি থেকে। সবাই কেবল রাষ্ট্র ধর্ম কায়েম করতে চেয়েছে কেউ এটাকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ব্যক্তির উপর ছেড়ে দেয়নি। ইভেন মহানবী সঃ ও এটা কায়েম করতে চেয়েছেন। আমি বুঝিনা ধর্ম কেন কায়েম করতে হবে? এটা এটা জরুরী? এটা হয়া উচিৎ যার যার ইচ্ছে। এই কায়েম করার নেশায় ই আমরা কেউ কারো বিশ্বাস কে এক্সেপ্ট করতে পারিনা। হয়ত অনেকে বলে ধর্ম নৈতিকতা শেখায় তাই দরকার। মানলাম দরকার। কিন্তু যারা ধর্ম বিশ্বাস করে তারা সবাই নীতি নৈতিকতা মানে? মানে না।মানে না বলে ল ইনফোর্স্মেন্ট এর দরকার হয়।
    ব্যক্তিগত ভাবে আমি বিশ্বাস করি এই অন্যের বিশ্বাসকে মেনে না নেওয়ার টেন্ডেন্সি আমরা তখন ই দূর করতে পারব যখন এই প্র‍্যাক্টিস টা আমরা প্রাইমারী স্কুল পরিবার এসব জায়গা থেকে শুরু করব। আর এটা তখন ই করা সম্ভব যখন স্কুল গুলো থেকে ধর্ম বই ম্যান্ডাটরি করার ব্যাপারটা দূর করা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *