বাসাবো বৌদ্ধ মন্দিরে সম্প্রীতির ইফতার

রাজধানীর বাসাবো সবুজবাগে অবস্থিত ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহামন্দিরের মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকে সবসময়। ফটকের সামনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে পুলিশ। মন্দিরের ভেতরে কেউ প্রবেশ করতে চাইলে পড়তে হয় নিরাপত্তারক্ষীদের প্রশ্নের মুখে- এটা বছরের ১১ মাসের সাধারণ চিত্র। তবে এই চিত্রটাই বদলে যায় রোজার সময়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে খুলে যায় প্রধান ফটক। তবে তা সমাজের কোনও বিত্তশালী কিংবা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য নয়।
বিকেলে যারা সারি বেঁধে মন্দিরে ঢুকতে থাকেন তারা সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, মাটি কাটা শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা এমনকি ভিক্ষুকও। মোট কথা সমাজের নিম্নবিত্তরাই এখানে প্রবেশ করেন ইফতারের আগে আগে। আর তাদের জন্য প্যাকেটভর্তি ইফতার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের প্রধানসহ অন্যরা। এ চিত্র গত ছয় বছরের।
শুরুর দিকে ইফতার নিতে আসা মানুষের সংখ্যা এক দেড়শ’ থাকলেও এখন সে সংখ্যা প্রায় পাঁচশ’ ছাড়িয়ে গেছে। প্রধান ফটকের নিরাপত্তার দায়িত্বে সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত থাকেন নড়াইলের আজাদ মুন্সি। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে আমি এখানে আছি, রোজার মাসে এই মন্দিরে নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য ইফতার দেওয়া দেখি।
.
       

 

বৌদ্ধ মন্দির থেকে মুসলিমদের ইফতার দেওয়া হচ্ছে। যারা দিচ্ছেন আর যারা নিচ্ছেন- দু’দলই বলছে, এটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির, এখানে কোনও ধর্মের ভেদাভেদ নেই।
‘আমরা সবাই মানুষ, তারপর বাঙালি, এখানে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিটাই আসল কথা, কে বৌদ্ধ, কে মুসলিম, কে হিন্দু-খ্রিস্টান সেটা যার যার ধর্মে, সবাই একসঙ্গে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারি, এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই, এটাই মনুষ্য জীবনের আনন্দ’- কথাগুলো বলেন ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মন্দির প্রধান শুদ্ধানন্দ মহাথেরো।
একই কথা সবুজবাগ এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করা পারুলেরও। ‘ধর্ম ভিন্ন হইছেতো কী হইছে? ভাতের লগে কিছু না।’

এলাকাবাসী এবং মন্দির প্রধানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গত ছয় বছর ধরে এই মন্দির থেকে নিম্নবিত্তদের জন্য ইফতারি দেওয়া হচ্ছে। মন্দিরের সামনে অবস্থিত হারুন হোটেল পুরো ইফতার বানানোর কাজ তদারকি করে। হারুন হোটেলের ম্যানেজার কৃষ্ণপদ সাহা। প্রতিদিন সকালে মন্দির থেকে টাকা দিয়ে দেওয়া হয় কৃষ্ণকে, দুপুরের পরেই মন্দিরের ভেতরে অবস্থিত রান্নাঘরে বেগুনি, আলুর চপ, পিঁয়াজি আর ছোলা ভাজা হয়। আর ইফতারির প্যাকেটে এর সঙ্গে আরও থাকে জিলাপি এবং মুড়ি। পঞ্চাশ টাকা করে খরচ ধরা হয় এই প্যাকেটের আর প্যাকেট করা হয় প্রতিদিন পাঁচশ’র মতো। কেউ কেউ ইফতারের পরও আসেন ইফতার নিতে, তখনও তারা খালি হাতে ফেরেন না।

 


মন্দির প্রধান শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জায়গা থেকে যতটুকু পারি এই খেটে খাওয়া মানুষদের সাহায্য করতে চেষ্টা করছি। সারাদিন রোজা রেখে কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, ইফতারের জন্য যেন তাকে কোনও চিন্তা করতে না হয়, শুধু পানি খেয়ে যেন তাকে ইফতার না করতে হয়, সেজন্য আমার এ ক্ষুদ্র চেষ্টা। আর এ কাজে এলাকাবাসী আমাকে খুব সাহায্য করেন, সাহায্য করেন এদেশে ব্যবসা করতে আসা কয়েকজন বিদেশিও। একজন বিদেশি আছেন যিনি এই মন্দিরে প্রতিমাসে এক লাখ টাকার চাউল দেন। বাসাবো এলাকার হাজী নেকবর হোসেন চাউল দিয়ে আসছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। এভাবেই সবার সহযোগিতায় মন্দিরের ভেতরে থাকা আশ্রম আর এই ইফতার আমি চালিয়ে নিচ্ছি।’

রাজনৈতিক নেতারা সাহায্য করেন কি না- জানতে চাইলে শুদ্ধানন্দ বলেন, ‘নাহ… নেতারা কথা বলেন বেশি কিন্তু কাজ করেন না। বরং সাধারণ মানুষই সবসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।’
শুদ্ধানন্দ মহাথেরো জানান, ১৯৪৮ সালে তার মা মারা যান। এরপর তিনি গেরুয়া পোশাক পরা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সেই যে পথে নামলাম আর ঘরে ফিরি নাই। পারিবারিক সম্পদ ছিল বিস্তর, কিন্তু সেগুলো আমাকে টানলো না। পুরো জীবনটা চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে। তারই ধারাবাহিকতায় এই ইফতার আয়োজন। তবে আমি না থাকলে যেন এই আয়োজন বন্ধ না হয় সেজন্য আমার আশ্রম থেকে আমি কাউকে কাউকে তৈরি করছি। আমার স্বপ্ন, এই মন্দির যতদিন থাকবে ততোদিন যেন এই ইফতার আয়োজন থাকে। ধীরে ধীরে তা যেন আরও বাড়ে।’
 


চল্লিশ বছর ধরে সবুজবাগ এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন পারুল। ছয় বছর ধরেই এই ইফতার নিয়ে যান তিনি। পারুল বলেন, ‘ঈদের আগে আগে ইফতারের সঙ্গে আরও অনেক কিছু দিবো হেরা। শাড়ি লুঙ্গি জামাও দিবো ঈদের লেইগ্যা। পোলার চাউল, সেমই, চিনি- ঈদের দিন সেমইর জন্য চিন্তা করন লাগবো না, পোলার চাউল কিনন লাগবো না- এরচে বড় আর কী কিছু হয়।’
বৌদ্ধ মন্দিরের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ। তিনি বলেন, ‘যারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের আমি সাধুবাদ জানাই এবং তাদের উদার মনের প্রশংসা করি। একইসঙ্গে অন্যরাও যেন এতে উদ্বুদ্ধ হয়, এই শিক্ষাটা নেয়, সবাই যেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহিষ্ণু, সহমর্মী এবং সহানুভুতিশীল হয়। সেই সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব সর্ম্পকেও যেন সচেতন হয় সেটাও আশা করি।’

ইমাম ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, ‘একজন রোজাদারকে ইফতার করানোটাই পূণ্য। পরকালেতো বিচার হবে আল্লাহ যেভাবে চাইবেন সেভাবে। তবে দুনিয়াতে একজনের পূণ্যের কাজকে আল্লাহ নিশ্চয় মর্যাদা দেবেন।’

Source : Bangla Tribune, Al Jazeera

0 comments on “বাসাবো বৌদ্ধ মন্দিরে সম্প্রীতির ইফতারAdd yours →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *